কভার

১৯৭০ বিশ্বকাপ নিয়ে বিস্ময়কর স্মৃতি শোনালেন রিভেলিনো

পেলে,

‘ইতালির বিপক্ষে ফাইনালই ছিল সবচেয়ে সহজ ম্যাচ’

ফুটবল ইতিহাসের সেরা দলগুলোর তালিকা তৈরি হলে ১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলটির নাম সবার আগে চলে আসে। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও, জারসন ও রবার্তো রিভেলিনোর মতো কিংবদন্তিদের নিয়ে গড়া সেই দলকে আজও অনেকেই সর্বকালের সেরা জাতীয় দল হিসেবে বিবেচনা করেন।

বিশ্বকাপ জয়ের ৫৬ বছর পরও সেই স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল ব্রাজিল কিংবদন্তি রবার্তো রিভেলিনোর মনে। সম্প্রতি তিনি ১৯৭০ বিশ্বকাপের নানা স্মৃতি তুলে ধরেছেন, যেখানে উঠে এসেছে মেক্সিকান সমর্থকদের ভালোবাসা, পেলের জনপ্রিয়তা এবং ইতালির বিপক্ষে ঐতিহাসিক ফাইনালের গল্প।

গুয়াদালাহারায় শুরু হয়েছিল বিশেষ এক সম্পর্ক

রিভেলিনোর মতে, ১৯৭০ বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না; এটি ছিল ব্রাজিল ও মেক্সিকোর মানুষের মধ্যে এক আবেগঘন সম্পর্কের সূচনা।

বিশ্বকাপ চলাকালে ব্রাজিল দল পুরো সময় মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা শহরে অবস্থান করেছিল। প্রতিটি ম্যাচ জয়ের কারণে তাদের শহর পরিবর্তন করতে হয়নি। ফলে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দলের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।

রিভেলিনো স্মরণ করেন, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ব্রাজিল দলের প্রতি সমর্থন জানাতো। স্থানীয়রা শুধু অতিথি হিসেবে নয়, নিজেদের দল হিসেবেই ব্রাজিলকে গ্রহণ করেছিল।

মেক্সিকো বিদায়ের পর ব্রাজিল হয়ে ওঠে সবার দল

স্বাগতিক মেক্সিকো কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। মেক্সিকান সমর্থকরা তখন পুরোপুরি ব্রাজিলের পাশে দাঁড়ায়।

রিভেলিনোর ভাষায়, ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। মাঠে তাদের খেলার জাদু মানুষকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিল যে পুরো দেশ ব্রাজিলের সমর্থকে পরিণত হয়।

সেই সমর্থন খেলোয়াড়দের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। প্রতিটি ম্যাচে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্রাজিল দল

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল তাদের খেলা ছয়টি ম্যাচই জিতেছিল। প্রতিটি ম্যাচে দলটি যেন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছিল।

পেলের নেতৃত্বে আক্রমণভাগ ছিল দুর্দান্ত। জাইরজিনহো প্রতিটি ম্যাচে গোল করেন, জারসন মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন এবং রিভেলিনো তার বিখ্যাত বাঁ-পায়ের শটে প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক হয়ে ওঠেন।

রিভেলিনোর মতে, সেই সময় তাদের দল এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে আরও কয়েকটি ম্যাচ খেললেও কেউ তাদের হারাতে পারত না।

ইতালির বিপক্ষে ফাইনালই ছিল সবচেয়ে সহজ ম্যাচ!

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী দল ইতালির বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালকে সাধারণত কঠিন লড়াই হিসেবেই ধরা হয়। কিন্তু রিভেলিনোর দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তার দাবি, পুরো টুর্নামেন্টের মধ্যে সবচেয়ে সহজ ম্যাচ ছিল ইতালির বিপক্ষে ফাইনাল।

প্রথমার্ধ ১-১ সমতায় শেষ হলেও দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল ফুটবলের এক অনন্য প্রদর্শনী উপহার দেয়। জারসন, জাইরজিনহো এবং কার্লোস আলবার্তোর গোলের মাধ্যমে ব্রাজিল ৪-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে।

রিভেলিনো বলেন, ম্যাচে তাদের আধিপত্য এতটাই ছিল যে আরও পাঁচ কিংবা ছয়টি গোলও হতে পারত। এমনকি এক পর্যায়ে তাকে ফাউল করে থামানো হলেও পেনাল্টি দেওয়া হয়নি।

পেলের মাথায় সোমব্রেরো, আজটেকায় উৎসবের ঝড়

ফাইনাল শেষ হওয়ার পর যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা আজকের ফুটবলে কল্পনা করাও কঠিন।

মেক্সিকোর বিখ্যাত আজটেকা স্টেডিয়ামে প্রায় এক লাখ দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ম্যাচ শেষ হতেই হাজার হাজার সমর্থক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে মাঠে নেমে আসেন।

উল্লাসে মাতোয়ারা সমর্থকেরা ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ঘিরে ধরেন। সেই সময় কেউ একজন পেলের মাথায় একটি ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান সোমব্রেরো টুপি পরিয়ে দেন।

রিভেলিনোর ভাষায়, পুরো মাঠ তখন আনন্দ, উচ্ছ্বাস এবং বিশৃঙ্খলার এক অসাধারণ মিশ্রণে পরিণত হয়েছিল।

তিনি হাসতে হাসতে স্মরণ করেন, কিছু সমর্থক তোস্তাওকে ঘিরে এতটাই উন্মাদনা দেখিয়েছিল যে প্রায় তার জার্সি ও পোশাক খুলে নেওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

কেন আজও বিশেষ ১৯৭০ বিশ্বকাপ?

অনেক বিশ্বকাপ এসেছে, অনেক কিংবদন্তি জন্ম নিয়েছে। কিন্তু ১৯৭০ সালের ব্রাজিল দল এখনও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নের নাম।

সেই দলের ফুটবল ছিল শিল্পের মতো সুন্দর, আক্রমণভাগ ছিল ভয়ঙ্কর, আর মাঠে তাদের বোঝাপড়া ছিল অবিশ্বাস্য।

বিশেষ করে পেলে ও রিভেলিনোদের প্রজন্ম শুধু একটি বিশ্বকাপ জেতেনি, তারা ফুটবলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

১৯৭০ বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল শুধু একটি ম্যাচ নয়, এটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়। ইতালির বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়, পেলের জাদু, আজটেকা স্টেডিয়ামের উন্মাদনা এবং মেক্সিকান জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে নাড়া দেয়।

রবার্তো রিভেলিনোর স্মৃতিচারণ আবারও মনে করিয়ে দেয় কেন ১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ফুটবল দল বলে মনে করেন।

 

Related posts

বাকলিয়ায় আবারও ধর্ষণের শিকার কিশোরী, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

gnabi

‘যদি আমরা যুদ্ধের ফলাফল জানতাম, তবে এই যুদ্ধ কখনোই শুরু করতাম না’

gnabi

প্রস্তুতি ম্যাচে আত্মবিশ্বাসী দুই লাতিন শক্তি

gnabi